দেশ ও জাতি ভেদে নববর্ষের সূচনা দিবস বিভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই বর্ষবরণ একটি মঙ্গলময় অনুষ্ঠান। অতীতের অপ্রাপ্তি, জীর্ণতা, ব্যর্থতা – সব কিছু ভুলে মানুষ বছরের নতুন দিনটি শুরু করতে চায় নতুনভাবে, নতুন উদ্যমে। অনাগত জীবনের প্রতি এই অনুরাগের মর্মস্পন্দন সর্বত্র এক, অভিন্ন।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের ফসল বপন, ফসল তোলার দিনক্ষণের গণনার জন্য ঋতু পরিবর্তনের হিসাব রাখা ছিল জরুরি। সেই তাগিদ থেকে উদ্ভব হয় বর্ষপঞ্জির। যুগে যুগে জাতিভেদে, গোত্রভেদে, জলবায়ুভেদে, ধর্মভেদে তৈরি হয়েছে নানান বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার। মায়ান ক্যালেন্ডার, অ্যাজটেক ক্যালেন্ডার, বেবিলনীয় ক্যালেন্ডার, রোমান ক্যালেন্ডার, পারসীয় ক্যালেন্ডার বা বৈদিক ক্যালেন্ডার। কখনও চাঁদকে, কখনও সূর্যকে বা কখনো দুটিকেই সূচক হিসেবে ধরে তৈরি হয়েছে এসব। সময়ের প্রয়োজনে তাতে এসেছে নানান পরিবর্তন, আবার কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে অনেকগুলোই।
প্রাচীন মিশরে যে ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল তার প্রতি মাসে ৩০ দিন করে ১২ মাসে ছিল মোট ৩৬০ দিন। বাকি ৫/৬ দিনে নানান উৎসব পালন করা হত। এ ক্যালেন্ডারে সাতদিনের সপ্তাহের হিসাব বাদ দিয়ে দশদিনের সপ্তাহের প্রচলন করা হয়। প্রতি মাসে তিনটি সপ্তাহ—এর প্রথম নয়দিনই কর্মদিবস হিসেবে পালন করা হতো, শেষেরদিন ছিল বিশ্রামের দিন। ফরাসী বিপ্লবের সময় ফ্রান্সে প্রায় একইধরনের ক্যালেন্ডারের প্রচলন হয়। এসময় এক নতুন ঘড়ি প্রচলনেরও চেষ্টা করা হয় যাতে একদিনকে ১০ ঘন্টায় ভাগ করা হয়; ১ ঘন্টায় ১০০ মিনিট, ১ মিনিটে ১০০ সেকেন্ড। এভাবে প্রতিদিন ১০০০০ সেকেন্ড। পরে সম্রাট নেপোলিয়ন এ ক্যালেন্ডার বিলুপ্ত করেন।
ইসলামী ক্যালেন্ডার হযরত মুহাম্মদ (স.) এর হিজরতের দিনকে প্রথম দিন হিসেবে ধরে ‘হিজরি’ সাল গণনার সূত্রপাত। এ ক্যালেন্ডার চন্দ্রনির্ভর, তাই মাসগুলো চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে ২৯ অথবা ৩০ দিনের হয়। সাধারনত: ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে এক বছর সম্পন্ন হয়।
বাংলায় মুঘল সম্রাট আকবর নতুন বর্ষপঞ্জি চালুর আগ পর্যন্ত হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শুল্ক আদায় করা হত। চন্দ্রনির্ভর বর্ষপঞ্জি প্রতিবছর ১১ দিন করে এগিয়ে যাবার কারনে ফসলের মৌসুমের সাথে বর্ষপঞ্জির আর সামঞ্জস্য থাকেনা। এই বিপদ ঘোঁচাতে চালু হয় নতুন একটি বর্ষপঞ্জি। ৯৬৩ হিজরি সালকে ৯৬৩ বাংলা সন ধরে নতুন সৌরনির্ভর গণনা শুরু হয়।
চাইনিজ ক্যালেন্ডার অনেকটাই দুবোর্ধ্য। একটা সহজ থাম্ব রুল হলো এরকম—চন্দ্রমাস অনুযায়ী ১২ মাসে ৩৫৩ বা ৩৫৪ দিন থাকে। কিন্তু সৌরবছরের সাথে মিল রাখার জন্য লিপ ইয়ারে তা হয়ে যায় ১৩ মাস বা ৩৮৩/৩৮৪ দিন। একারনে চাইনিজ নববর্ষ সবসময়ই ২১ জানুয়ারী থেকে ২১ ফেব্রুয়ারী এর মধ্যে হয়ে থাকে। অন্যান্য ক্যালেন্ডারের মতো চাইনিজ ক্যালেন্ডার অনন্তকাল পর্যন্ত চলে না, বরং ৬০ বছরের এক একটি চক্রে আবর্ত হয়। একটি চক্রের ৬০ বছরকে নানান স্বর্গীয় নাম ও পশুর নামের সমন্বয়ে নামকরণ করা হয়। এই যেমন ইঁদুর, ষাঁড়, বাঘ, খরগোশ, ড্র্যাগন, সাপ, ঘোড়া, মেষ, বানর, মুরগি, কুকুর, শুকরের বছর।
বাহাই ধর্মাবলম্বীদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী উনিশ দিনে মাস, উনিশ মাসে বছর; এভাবে ৩৬১দিন, সাথে অতিরিক্ত ৪ দিন। মার্চের ২১ তারিখ মহাবিষুবের দিন তাদের নববর্ষের দিন। আবার মরোক্কবাসী নববর্ষ পালন করে হিজরি ১০ মহররম তারিখে। নাইজেরিয়া ও বেনিনের ইয়োরুবা সম্প্রদায় জুনের ৩ তারিখে নববর্ষ পালন করে। পশ্চিম আফ্রিকার উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে তিনদিন নববর্ষ পালন করে থাকে। আবার ইথিওপিয়ায় নববর্ষ হলো সেপ্টেম্বর ১১।
যে যেদিনই পালন করুক না কেনো নববর্ষের প্রথম দিনটি সার্বজনীনভাবেই সৌভাগ্যের বিষয়। আর তা বরণ করতে মানুষ আয়োজন করে নানান আচার-অনুষ্ঠান, পালন করে নিজস্ব সংস্কারে।
বর্ষবরণ উপলক্ষে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, লুসাই, খিসা, চাক, খেয়াং, ম্রোসহ বিভিন্ন পাহাড়ি পল্লীগুলো তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে নববর্ষ পালন করে। পুরনো বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে বরণ করাকে ত্রিপুরারা ‘বৈসু’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’, চাকমারা ‘বিজু’ ও তংচঙ্গ্যারা ‘বিসু’ বলে থাকে। এ ৪টি নামকে মিলিয়ে তাই এ অনুষ্ঠানকে ‘বৈসাবি’ নামেই বেশি পরিচিত। চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে বৈশাখ মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত অত্যন্ত আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালিত হয়। প্রায় একই সময়ে একই ধরনের উৎসব হয় মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়ায়।
চাইনিজরা পূর্ণিমার শুরুর দিন থেকে শুক্লপক্ষের পনের দিন পর্যন্ত পালন করে উৎসব। নববর্ষই হচ্ছে তাদের প্রধান উৎসব, তাই পৃথিবীর প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহন করে। চীন ছাড়াও সিংগাপুর, মালায়শিয়া, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর যেখানেই চায়নাটাউন আছে সেখানেই চলে সাজসজ্জা, ভুরিভোজ আর দেবতাদের প্রতি বিশেষ প্রার্থনা।
জার্মানরা গলিত সীসা পানিতে ঢেলে তাদের ভাগ্য দেখার চেষ্টা করে। সীসা জমে আংটি বা হৃৎপিন্ডের কাছাকাছি কোন আকার ধারন করলে তারা ধরে নেয় নতুন বছরে বিবাহ আসন্ন। নৌকা জাতীয় কোন আকার ধারন করলে যাত্রা শুভ।
পর্তুগীজ আর স্প্যানিয়ার্ডরা রাত বারোটা বাজার সাথে বারোটা করে আঙুর খেয়ে নেয়। তাদের ধারনা এই আঙুরগুলো সামনের বারোমাস তাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। আবার পেরুর লোকেরা মনে করে আঙুর আরো একটা বেশি খেলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। ফিলিপাইনসে বাচ্চারা রাত বারোটায় সর্বশক্তিতে লাফাতে থাকে; যাতে তারা লম্বা হয়।
নববর্ষ পালনের দিন ভিন্ন হতে পারে, থাকতে পারে ভিন্ন রীতি; কিন্তু এর আবেদন সবার কাছে সমান। সবার রয়েছে অতীতের দুঃখ-শোক ধুয়ে মুছে নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন । আর এ স্বপ্নে বিভোর হয়ে বছরের প্রথম দিনটিতে মোহময় করার জন্য স্বাড়ম্বরের সাথে সবার সমন্বিত প্রার্থনা – নতুন বছর শুভ হোক।
সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। ভাল থাকুন আগামী বৈশাখের প্রথম সূর্যোদয় নাগাদ।